১০:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

ফুটবলের গৌরব গাঁথা

নিউজ আপডেট
নিউজ আপডেট

প্রতিবেদক: সামি মাহমুদ চৌধুরী

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি “ফুটবল মানেই ব্রাজিল”। হলুদ জার্সি, ৫টা বিশ্বকাপের স্টার – ব্রাজিলের নামটাই আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে। পাশাপাশি শুনেছি, আর্জেন্টিনা নাকি “এই সেদিনের দল”, ফুটবলে তাদের নাকি গৌরব বলতে কিছুই নেই। কিন্তু ফুটবলের আসল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ছবিটা একদম উল্টো।

*ইউরোপের বাইরে ফুটবলের পথিকৃৎ আর্জেন্টিনা*
ইউরোপের বাইরে প্রথমবারের মতো ফুটবলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্জেন্টিনার মাটিতেই। ১৮৬৭ সালে আর্জেন্টিনায় প্রথম অফিসিয়াল ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের বাইরে প্রথম ফুটবল লিগের সূচনাও করে আর্জেন্টিনা, ১৮৯১ সালে। অথচ ব্রাজিলে ফুটবলের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্জেন্টিনার অন্তত তিন দশক পরে।

*বিশ্বকাপের প্রথম দিন থেকেই শীর্ষে*
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের প্রথমার্ধে উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে ৪-২ গোলে হেরে যায় তারা। সেদিন চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দিন থেকেই আর্জেন্টিনার উপস্থিতি ছিল শীর্ষ সারিতে। পরবর্তীতে ১৯০ ও ২০১৪ সালের ফাইনালেও জার্মানির কাছে মাত্র ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে তারা। ১৯০ সালে ৮৬ মিনিটে পেনাল্টি গোল, আর ২০১৪ সালে ১৩ মিনিটে গোল খেয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়। এই হিসেবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ৫টা নয়, ৬টা স্টার থাকার দাবি রাখে অনেকেই।

*কোপা আমেরিকার একচ্ছত্র সম্রাট*
আন্তর্জাতিক ট্রফির হিসেবে আর্জেন্টিনা আরও এগিয়ে। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের টুর্নামেন্ট কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ *১৬ বার* চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোপা আমেরিকার ফাইনাল তারা খেলেছে *মোট ২৯ বার* – যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২১ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার কোপা জিতে তারা প্রমাণ করেছে অতীতের গৌরব তারা ধরে রাখতে জানে। ফাইনালে ওঠার এই ধারাবাহিকতাই আর্জেন্টিনাকে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের প্রকৃত রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

*বিশ্ব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল আইকন*
বিশ্ব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল সুপারস্টার ছিলেন আর্জেন্টিনার আলফ্রেদো ডি স্টেফানো। “ব্লন্ড অ্যারো” খ্যাত এই কিংবদন্তিই রিয়াল মাদ্রিদকে এনে দেন তাদের প্রথম ৫টি ইউরোপিয়ান কাপ। রিয়াল মাদ্রিদের ৯টি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফির ৫টিই তার হাত ধরে আসা। রিয়ালের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নামে স্টেডিয়ামের নামকরণ না হলে, স্টেডিয়ামটির নাম হতো ডি স্টেফানোর নামেই।

*কোচিং দর্শনের জনক*
ক্লাব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল স্টার কোচও ছিলেন একজন আর্জেন্টাইন – হেলেনিও হেরা। তিনিই প্রথম দেখান ফুটবল আসলে কোচ-কেন্দ্রিক খেলা। তার হাত ধরেই ইতালীয় ফুটবলের বিখ্যাত “কাতেনাচ্চিও” দর্শনের জন্ম। ইন্টার মিলানকে টানা দুবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতানো এই মস্তিষ্কই আধুনিক কোচিংয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন।

*উপসংহার: ইতিহাসের প্রতি অবিচার*
অথচ বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় আর্জেন্টিনার এই সুবর্ণ অতীত নিয়ে লেখালেখি চোখে পড়ে না। বরং প্রচার করা হয়, বাংলাদেশের মানুষ বোকার মতো আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে, তারা ফুটবল বোঝে না।

বাস্তবতা হলো, আর্জেন্টিনার আছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত, আছে ১৬ বার কোপা আমেরিকা জয় ও ২৯ বার ফাইনাল খেলার রেকর্ড, আছে গত তিন বিশ্বকাপের দুটির ফাইনাল খেলার মতো সুফলা বর্তমান। ডি স্টেফানো, ম্যারাডোনা, মেসিদের জন্ম দেওয়া ভূমি থেকে ফুটবলের আরেক বরপুত্র নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে আবার – সোনালি সুদিনের জন্য এটুকু প্রার্থনাই করতে পারি।

আর্জেন্টিনার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে কীভাবে আড়াল করে রাখা হয়, সে গল্প আরেকদিন।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৯:৪৯:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

ফুটবলের গৌরব গাঁথা

আপডেট: ০৯:৪৯:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

প্রতিবেদক: সামি মাহমুদ চৌধুরী

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি “ফুটবল মানেই ব্রাজিল”। হলুদ জার্সি, ৫টা বিশ্বকাপের স্টার – ব্রাজিলের নামটাই আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে। পাশাপাশি শুনেছি, আর্জেন্টিনা নাকি “এই সেদিনের দল”, ফুটবলে তাদের নাকি গৌরব বলতে কিছুই নেই। কিন্তু ফুটবলের আসল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ছবিটা একদম উল্টো।

*ইউরোপের বাইরে ফুটবলের পথিকৃৎ আর্জেন্টিনা*
ইউরোপের বাইরে প্রথমবারের মতো ফুটবলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্জেন্টিনার মাটিতেই। ১৮৬৭ সালে আর্জেন্টিনায় প্রথম অফিসিয়াল ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের বাইরে প্রথম ফুটবল লিগের সূচনাও করে আর্জেন্টিনা, ১৮৯১ সালে। অথচ ব্রাজিলে ফুটবলের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় আর্জেন্টিনার অন্তত তিন দশক পরে।

*বিশ্বকাপের প্রথম দিন থেকেই শীর্ষে*
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের প্রথমার্ধে উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে ৪-২ গোলে হেরে যায় তারা। সেদিন চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দিন থেকেই আর্জেন্টিনার উপস্থিতি ছিল শীর্ষ সারিতে। পরবর্তীতে ১৯০ ও ২০১৪ সালের ফাইনালেও জার্মানির কাছে মাত্র ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে তারা। ১৯০ সালে ৮৬ মিনিটে পেনাল্টি গোল, আর ২০১৪ সালে ১৩ মিনিটে গোল খেয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়। এই হিসেবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ৫টা নয়, ৬টা স্টার থাকার দাবি রাখে অনেকেই।

*কোপা আমেরিকার একচ্ছত্র সম্রাট*
আন্তর্জাতিক ট্রফির হিসেবে আর্জেন্টিনা আরও এগিয়ে। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের টুর্নামেন্ট কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ *১৬ বার* চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোপা আমেরিকার ফাইনাল তারা খেলেছে *মোট ২৯ বার* – যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২১ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার কোপা জিতে তারা প্রমাণ করেছে অতীতের গৌরব তারা ধরে রাখতে জানে। ফাইনালে ওঠার এই ধারাবাহিকতাই আর্জেন্টিনাকে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের প্রকৃত রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

*বিশ্ব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল আইকন*
বিশ্ব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল সুপারস্টার ছিলেন আর্জেন্টিনার আলফ্রেদো ডি স্টেফানো। “ব্লন্ড অ্যারো” খ্যাত এই কিংবদন্তিই রিয়াল মাদ্রিদকে এনে দেন তাদের প্রথম ৫টি ইউরোপিয়ান কাপ। রিয়াল মাদ্রিদের ৯টি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফির ৫টিই তার হাত ধরে আসা। রিয়ালের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নামে স্টেডিয়ামের নামকরণ না হলে, স্টেডিয়ামটির নাম হতো ডি স্টেফানোর নামেই।

*কোচিং দর্শনের জনক*
ক্লাব ফুটবলের প্রথম গ্লোবাল স্টার কোচও ছিলেন একজন আর্জেন্টাইন – হেলেনিও হেরা। তিনিই প্রথম দেখান ফুটবল আসলে কোচ-কেন্দ্রিক খেলা। তার হাত ধরেই ইতালীয় ফুটবলের বিখ্যাত “কাতেনাচ্চিও” দর্শনের জন্ম। ইন্টার মিলানকে টানা দুবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতানো এই মস্তিষ্কই আধুনিক কোচিংয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন।

*উপসংহার: ইতিহাসের প্রতি অবিচার*
অথচ বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় আর্জেন্টিনার এই সুবর্ণ অতীত নিয়ে লেখালেখি চোখে পড়ে না। বরং প্রচার করা হয়, বাংলাদেশের মানুষ বোকার মতো আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে, তারা ফুটবল বোঝে না।

বাস্তবতা হলো, আর্জেন্টিনার আছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত, আছে ১৬ বার কোপা আমেরিকা জয় ও ২৯ বার ফাইনাল খেলার রেকর্ড, আছে গত তিন বিশ্বকাপের দুটির ফাইনাল খেলার মতো সুফলা বর্তমান। ডি স্টেফানো, ম্যারাডোনা, মেসিদের জন্ম দেওয়া ভূমি থেকে ফুটবলের আরেক বরপুত্র নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে আবার – সোনালি সুদিনের জন্য এটুকু প্রার্থনাই করতে পারি।

আর্জেন্টিনার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে কীভাবে আড়াল করে রাখা হয়, সে গল্প আরেকদিন।